বউ-চণ্ডীর মাঠ
গ্রামের বাঁওড়ের মধ্যে নৌকো ঢুকেই জল-ঝাঁঝির দামে আটকে গেল।
কানুনগো হেমেনবাবু বললেন—বাবলা গাছটার গায়ে কাছি জড়িয়ে বেঁধে নাও…
বাইরের নদীতে ভাটার টান ধরেছে, নাটা-কাঁটার ঝোপের নীচের জল সরে গিয়ে একটু একটু করে কাদা বার হচ্ছে।
হেমেনবাবু বললেন—একটুখানি নেমে দেখবেন না কোথায় পিন ফেলা হয়েছে? যত শিগগির খানাপুরীটা শেষ হয়ে যায়…
এমন সুন্দর বিকালটাতে আর কাজ করতে ইচ্ছা হল না। পিছনের নৌকো থেকে লোকজনেরা নেমে জায়গা ঠিক করে সেখানে তাঁবু ফেলবে। জরিপের বড়ো সাহেবের শিগগির সদর থেকে আসবার কথা আছে, কাজেই যত তাড়াতাড়ি কাজ আরম্ভ হয়, সকলের সেই দিকে ঝোঁক। সাব ডেপুটি নৃপেনবাবু কাজ শেখবার জন্যে এইবার প্রথম খানাপুরীর কাজে এসেছিলেন। বয়স বেশি না, ছোকরা— কিন্তু মাঝনদীতে নৌকো দুললেই তাঁর অত্যন্ত ভয় হচ্ছিল। বোধ হয় ভয়কে ফাঁকি দেবার জন্যেই তিনি এতক্ষণ ছই-এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বার ভান করে শুয়েছিলেন–এবার ডাঙায় নৌকো লাগাতে তিনি ছই-এর ভেতর থেকে বার হয়ে এলেন এবং একটু পরে হেমেনবাবুর সঙ্গে কথায় কথায় কী নিয়ে বেশ একটু তর্ক শুরু করলেন।
নৃপেনবাবুকে বললুম—Tenancy Act-কচকচিতে আর দরকার নেই, তার চেয়ে বরং চলুন নেমে তাঁবুর জায়গা ঠিক করা যাক—কাল সকালেই যাতে কাজ আরম্ভ করা যায়…
চৈত্র মাস যায় যায়। গ্রাম্য নদীটির দু-পাড় ভরে সবুজ সবুজ লতানো গাছে নীল-পাপড়ি বন-অপরাজিতা ফুল ফুটে আছে। বাঁশঝাড় কোথাও জলের ধারে নত হয়ে পড়েছে, তলায় আকন্দ ঘেঁটুফুলের বনফুলের ডালি মাথায় নিয়ে ঝিরঝিরে বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে। দু-ধারের রোদ-পোড়া কটা ঘাসওয়ালা মাঠের মাঝে মাঝে পত্র-বিরল বাবলা গাছে গাঙশালিকের ঝাঁক কিচ কিচ কচ্ছে—নদীর বাঁ-পাড়ের গায়ে গর্তের মধ্যে তাদের বাসা। মাকাল-লতার ঝোপের তলায় জলের ধারে কোথাও উঁচু উঁচু বনমুলোর ঝাড়, তাদের কুচো কুচো হলদে ফুল থেকে জায়ফলের মতো একটা ঘন গন্ধ উঠছে।…
বেলা আর একটু পড়লে আমরা সেই বাঁওড়ের ধারের মাঠে তাঁবুর জায়গা কোথায় ঠিক হবে দেখতে গেলুম। নদীর ধার থেকে গ্রাম একটু দূর হলেও গ্রামের মেয়েরা নদীতেই জল নিতে আসে। আমাদের যেখানে নৌকোখানা বাঁধা হয়েছিল, তার বাঁ-ধারে খানিকটা দূরে মাটিতে ধাপ-কাটা কাঁচা ঘাট। গ্রামের একজন বৃদ্ধ বোধ হয় নদীতে গ্রীষ্মের দিনের বৈকালে স্নান করতে আসছিলেন, তাঁকে আমরা জিজ্ঞাসা করলুম-রসুলপুর কোন গাঁ-খানার নাম মশাই? সামনের এটা, না ওই পাশে?
তিনি বললেন—আজ্ঞে না, এটা হল কুমুরে, পাশের ওটা আমডাঙা-রসুলপুর হল এ গাঁ-গুলোর পেছনে, কোশ দুই তফাত—আপনারা?
আমাদের পরিচয় শুনে বৃদ্ধ বললেন—এই মাঠটাতেই আপনারা তাঁবু ফেলবেন? আপনাদের জরিপের কাজ শেষ হতেও তো পাঁচ-ছয় মাস…
আমরা বললুম—তা তো হবেই, বরং তার বেশি…
বৃদ্ধ বললেন—এখানটা একটা ঠাকুরের স্থান, গাঁয়ের মেয়েরা পুজো দিতে আসে, বরং আর একটু সরে গিয়ে নদীর মুখের দিকে তাঁবু ফেলুন, নইলে মেয়েদের একটু অসুবিধে…
বৃদ্ধের নাম ভুবন চক্রবর্তী। জরিপ আরম্ভ হয়ে গেলে নিজের দরকারে চক্রবর্তী মশায় দলিলপত্র বগলে অনেকবার তাঁবুতে যাতায়াত শুরু করে দিলেন, সকলের সঙ্গে তাঁর বেশ মেশামেশি ও আলাপ পরিচয় হয়ে গেল। তাঁর পৈতৃক জমা-জমি অনেকে নাকি ফাঁকি দিয়ে দখল করেছে, আমাদের সাহায্যে এবার যদি সেগুলোর একটা গতি হয়—এইসব ধরনের কথা তিনি আমাদের প্রায়ই শোনাতেন।
আমি সেখানে বেশিদিন ছিলুম না। খানাপুরীর কাজ আরম্ভ হয়ে গিয়েছে, আমি সেদিনই জেলায় ফিরব—জোয়ারের অপেক্ষায় নৌকো ছাড়তে দেরি হতে লাগল। চক্রবর্তী মশায়ও সেদিন উপস্থিত ছিলেন। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলুম, এটাকে বউ-চণ্ডীর মাঠ বলে কেন চক্কত্তি মশাই? আপনাদের কী কোনো…
নৃপেনবাবুও বললেন—ভালো কথা, বলুন তো চক্রবর্তী মশাই, বউ-চণ্ডী আবার কী কথা—শুনিনি তো কখনো!
আমাদের প্রশ্নের উত্তরে চক্রবর্তী মশায়ের মুখে একটা অদ্ভুত গল্প শুনলুম। তিনি বলতে লাগলেন—শুনুন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments